৫৬তম অধ্যায়: যুবকদের প্রজ্ঞা দেশের প্রজ্ঞা
এই সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড়িয়ে, উ জুন্চেনের মনে প্রবল অস্বস্তি জন্ম নিল।
জনসম্মুখে পারফরম্যান্সের মঞ্চে ফাং শিংয়ের কাছে হেরে যাওয়াটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না।
তাছাড়া, কিছুক্ষণ আগেই মঞ্চের পেছনে তাদের চাওইন পঞ্চপান্ডবকে লিউ রোংশুয়ান বেশ ভালোভাবেই বকে দিয়েছিলেন।
হানফাং প্রোডাকশন টিম নিজ হাতে জনসম্মুখের পারফরম্যান্স মঞ্চ সাজিয়েছে, আর এই খরচটা চাওইন সংস্কৃতি নিজেই দিয়েছে।
তবুও, শেষ পর্যন্ত হার—এটা কোনোভাবেই চাওইন সংস্কৃতির পরিকল্পনায় ছিল না।
তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল, এই সুযোগে ফাং শিংকে একবার পরাজিত করে, যাতে তাকে বাধ্য করে চুক্তিতে সই করানো যায়।
ফলে, এত চেষ্টা-সাধনার পরও পরাজয়—নিশ্চয়ই লিউ রোংশুয়ান কল্পনা করতে পারছিলেন, বড় কর্তা হে হোংতুর মুখ তখন কতটা গম্ভীর।
সেই কারণে, পেছনের ঘরে তিনি উ জুন্চেনদের দিকে আঙুল তুলে প্রবল গালিগালাজ করলেন।
এতে করে, উ জুন্চেনের বুকের ক্ষোভ যেন কোনো উপায়েই বেরোতে পারছিল না।
সে হাত বাড়িয়ে উচ্চাসনে বসা ফাং শিংয়ের দিকে আঙুল তুলল, বলল, ‘‘আমি ফাং শিংকে চ্যালেঞ্জ করব।’’
‘‘তুমি কি নিশ্চিত? সত্যিই আবার ফাং শিংয়ের দলকে চ্যালেঞ্জ করতে চাও?’’ হ্য হাও আবারও নিশ্চিত হতে চাইলেন।
‘‘হ্যাঁ, যেখানে হেড়েছি, সেখান থেকেই উঠে দাঁড়াব।’’ দৃঢ় কণ্ঠে জানাল উ জুন্চেন, স্বরের মধ্যে ছিল প্রতিশোধের স্পর্শ।
হ্য হাও চোখ ফেরালেন উচ্চাসনের দিকে, জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘ফাং শিং, জুন্চেন আবারও তোমাদের দলকে চ্যালেঞ্জ করতে চায়, তার প্রতি কোনো পরামর্শ আছে?’’
ফাং শিং মুখে মৃদু হাসি এনে জবাব দিল, ‘‘আমি পরামর্শ দেব, আমাকে না বেছে নেয়, না হলে যেখানে পড়েছিল, আবারও সেখানেই পড়বে।’’
সাথে সাথেই দর্শকাসনে হইচই পড়ে গেল।
এই কথা বড়ই দম্ভের।
বিনোদনের মাত্রা যেন পূর্ণতায় পৌঁছাল।
উ জুন্চেনের ভক্তরা সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার, হাঁকডাক শুরু করল, কেউ কেউ তো গালিগালাজও করল।
হ্য হাও তাড়াতাড়ি পরিস্থিতি সামাল দিলেন, ‘‘ফাং শিং অধিনায়ক বরাবরের মতোই আত্মবিশ্বাসী। তো জুন্চেন অধিনায়ক, তোমাদের দলে কে অংশ নেবে?’’
এই সময়,
নিম্নাসন থেকে একজন উঠে হাত তুলল, ‘‘আমি।’’
সবাই তাকিয়ে দেখল, সে আর কেউ নয়, লিউ ইচেন।
দর্শকাসনে আবারও উত্তেজনা চরমে।
বিশেষ করে লিউ ইচেনের ভক্তরা উৎকণ্ঠায় চিৎকার করে উঠল, ‘‘ইচেন, দয়া করে না, হারলে তোমাকে বাদ পড়তে হবে!’’
হ্য হাও আবারও নিশ্চিত হয়ে বললেন, ‘‘ইচেন, তুমি কি সত্যিই অংশ নেবে? এই চ্যালেঞ্জ রাউন্ডে যে হারে, তাকে ‘আগামী তারকা’ মঞ্চ ছাড়তে হবে।’’
লিউ ইচেন মাথা নেড়ে বলল, ‘‘হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত।’’
এরপর হ্য হাও তাকালেন ফাং শিংয়ের দিকে, ‘‘তাহলে ফাং শিং অধিনায়ক, তোমাদের দল থেকে কে অংশ নেবে?’’
ফাং শিং সরাসরি উত্তর দিল, ‘‘শাও ইউ।’’
‘‘ফাং শিং, শাও ইউ, একটু অপেক্ষা করো। এখন মঞ্চ উ জুন্চেন ও লিউ ইচেনের হাতে তুলে দিলাম...’’
হ্য হাও লিউ ইচেনকেও মঞ্চে ডাকলেন, তারপর জানতে চাইলেন, ‘‘দর্শকদের বলো তো, চ্যালেঞ্জের জন্য কী গান নিয়ে এসেছো?’’
উ জুন্চেন ও লিউ ইচেন পরস্পর দৃষ্টিবিনিময় করে একসাথে উত্তর দিল, ‘‘এটা আমাদের দু’জনের গাওয়া নতুন গান, প্রথমবার পরিবেশিত হচ্ছে, নাম ‘আমরা এসেছি’।
‘‘গানে র্যাপের অংশের কথা আমরা দু’জনে মিলে লিখেছি, আশা করি সবাই পছন্দ করবে।’’
হ্য হাও প্রত্যাশায় ভরা কণ্ঠে বললেন, ‘‘তোমাদের কথা শুনে আরও আগ্রহ বাড়ছে, তাহলে আর দেরি না করে মঞ্চ ছেড়ে দিলাম উ জুন্চেন ও লিউ ইচেনের জন্য।’’
দর্শকাসনে সঙ্গে সঙ্গে উল্লাস।
এটাই সত্যিকার অর্থে উ জুন্চেন ও লিউ ইচেনের যুগলবন্দি।
কিছু ‘সিপি’ ভক্ত তো উত্তেজনায় আত্মা হারাতে বসেছে।
মঞ্চের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে এলো, ‘আমরা এসেছি’ গানের প্রস্তাবনা বাজতে লাগল।
প্রস্তাবনার সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চের বাম পাশে আলো জ্বলল, উজ্জ্বল করল উ জুন্চেনকে।
উ জুন্চেন স্পটলাইটে, ড্রামের তালে নাচতে শুরু করল।
নাচের মাঝপথে, বাম পাশের আলো নিভে গেল।
পরক্ষণেই, ডান পাশের আলো জ্বলে উঠল, আলোকিত করল লিউ ইচেনকে।
এবার লিউ ইচেন ড্রামের তালে নাচ শুরু করল।
প্রস্তাবনা শেষ হলে, দু’জনে একসাথে আলোয় এসে পালা করে গাইল প্রধান অংশ ও সুর।
সুর শেষ হলে, সংগীতের মাঝের অংশ দ্রুতগতিতে এগোতে লাগল।
উ জুন্চেন ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে ঝড়ের গতিতে র্যাপ করল—
‘‘আমি দাঁড়িয়ে আছি এই মঞ্চে, বিশ্বকে জানাচ্ছি, আমার সময় এসে গেছে।
‘‘নতুন কিংবদন্তি এখানেই শুরু, প্রতিটি মুহূর্তে চাই উজ্জ্বলতা।
‘‘শোনো, এই সুর আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে, দ্বিধা কোরো না, আমাদের সঙ্গে এসো, হাই! হাই! হাই...’’
এরপরই, লিউ ইচেন তার জায়গা নিল, ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে র্যাপ করল—
‘‘অনেক ঠাট্টা, অনেক অবজ্ঞা—আমি কিচ্ছু মনে রাখি না।
‘‘শুধু তোমরাই আমার শক্তির উৎস, তোমাদের ভালোবাসায় আমি কখনো হার মানি না।
‘‘তুমি পাশে থাকো বলেই এগোই, কুয়াশা পেরিয়ে, অবশেষে দেখব সূর্যোদয়...’’
এই র্যাপের তিনটি স্তবকেই দ্বৈত অনুপ্রাস, দারুণ স্পর্ধা দেখিয়েছে।
ফাং শিং প্রস্তুতি অঞ্চলে শুনে ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলল।
এবারের প্রতিপক্ষকে বেশ জমজমাট লাগছে।
এই র্যাপের কথা শুনে বোঝা যায়, হাশিমের তুলনায় অনেক ভালো।
কমপক্ষে এই গানের কথা অনুপ্রেরণাদায়ী, ইতিবাচক।
হাশিমের র্যাপের মতো নয়, যেখানে কেবল আত্মপ্রচারণা আর অন্যকে অপমান।
পারফরম্যান্সের আগে উ জুন্চেন বলেছিল, এই র্যাপ তারা নিজেরাই লিখেছে।
সত্যিই যদি তাই হয়, তাহলে বেশ চমৎকার।
তবে, এই গানের র্যাপ তাদের আগের গানের তুলনায় অনেক আলাদা, তাই উ জুন্চেনের কথায় কিছুটা অতিরঞ্জন আছে বলে মনে হয়।
...
উ জুন্চেন ও লিউ ইচেন গাওয়া শেষ করলে, হ্য হাও মঞ্চে উঠে এলেন।
‘‘ধন্যবাদ উ জুন্চেন, লিউ ইচেন, এত সুন্দর গান শোনানোর জন্য। নিঃসন্দেহে, এখন তোমাদের যুগ।’’
‘‘সবাইয়ের যুগ, সবার যুগ।’’—উ জুন্চেন ও লিউ ইচেন একসাথে মাথা নোয়াল।
হ্য হাও বললেন, ‘‘এবার পালা ফাং শিং ও শাও ইউয়ের, চ্যালেঞ্জের গান পরিবেশনের। দু’জন মঞ্চে ওঠো। জুন্চেন, ইচেন, তোমরা নিচে গিয়ে বিশ্রাম নাও।’’
ফাং শিং ও শাও ইউ মঞ্চে উঠলে, হ্য হাও প্রশ্ন করল—
‘‘উ জুন্চেন ও লিউ ইচেনের ‘আমরা এসেছি’ শুনে এখন টেনশন হচ্ছে?’’
শাও ইউ মাথা নেড়ে বলল, ‘‘একটু তো বটেই।’’
‘‘ফাং শিং?’’
‘‘চলবে।’’
হ্য হাও হাসি মুখে বলল, ‘‘দেখা যাচ্ছে, ফাং শিং অধিনায়ক আগের মতোই আত্মবিশ্বাসী।
‘‘এই চ্যালেঞ্জ রাউন্ডেও আজকের থিম অনুযায়ী গান বেছে নিতে হবে, মনে আছে আমাদের থিম?
‘‘ঠিকই, ‘যুবক আমি, সময়কে বৃথা হতে দেব না’। ফাং শিং অধিনায়ক, এবার কী ধরনের গান বেছে নিয়েছেন?
‘‘প্রথমেই বলুন তো, গানের কঠিন অংশ কোথায়? গাওয়া কি কষ্টকর?’’
ফাং শিং কিছুক্ষণ ভেবে বলল, ‘‘চালিয়ে নেওয়া যাবে, সর্বোচ্চ সুর হচ্ছে বি ফোর, তবে কঠিন দিক সুরে নয়।’’
হ্য হাও আবারও জিজ্ঞাসা করল, ‘‘তাহলে কঠিন দিকটা কী?’’
ফাং শিং আবারও চিন্তা করে বলল, ‘‘হৃদয়ের ব্যাপ্তি।’’
হ্য হাও ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল, ‘‘এই কথা দিয়ে ঠিক কী বোঝাতে চাইছো?’’
‘‘গান শুনলেই বুঝতে পারবে। সব উত্তর গানে আছে।’’
ফাং শিং আর ব্যাখ্যা করতে চাইলো না, তার প্রকাশ সবটাই গানের মধ্যে।
হ্য হাও আবারও বলল, ‘‘কিছুক্ষণ আগে আমি প্রযোজনা দল থেকে শুনেছি, নাকি গতকাল প্রস্তুতি সাক্ষাৎকারে তুমি এই গানে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছো, বলেছো, কেউ যদি তোমাকে ভোট না দেয়, সে-ই প্রকৃত সাহসী।’’
ফাং শিং হাসতে হাসতে বলল, ‘‘গান শুনে সবাই বুঝে যাবে কেন বলেছি।’’
‘‘তাহলে মঞ্চের দর্শকদের বলো, গানের নাম কী?’’
‘‘গানের নাম ‘যুবক চীনের ভাষণ’।’’
‘‘একটু দাঁড়াও, নামটা কেমন যেন চেনা চেনা শোনাচ্ছে।’’
‘‘হ্যাঁ, কিছু কথা নেওয়া হয়েছে লিয়াং ছি চাও-র প্রবন্ধ ‘যুবক চীনের ভাষণ’ থেকে।’’
ফাং শিং মাথা নেড়ে উত্তর দিল।
‘‘বুঝলাম, তাহলে মঞ্চ ছেড়ে দিচ্ছি ফাং শিং ও শাও ইউয়ের হাতে।’’
এই বলে হ্য হাও মঞ্চ থেকে নেমে গেলেন।