প্রথম অধ্যায়: অচিরেই থাইল্যান্ডে যাত্রা
সময় গড়াতে গড়াতে মে মাস এসে গেল। আমি ভেবেছিলাম এবার একটু ভালো করে বিশ্রাম নেব, কিন্তু হঠাৎ করেই আমার সঙ্গে কথা বলতে কিংবা আমার কাছে কাজের অনুরোধ নিয়ে আসা মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলল। খোঁজ নিয়ে দেখলাম, তারা সবাই কোনো না কোনো অ্যাডভেঞ্চার ফোরাম, বার্তা বোর্ড বা অদ্ভুত কিছু ওয়েবসাইট থেকে আমার যোগাযোগের তথ্য পেয়ে আমার কাছে এসেছে। কে আমার তথ্য ফাঁস করল, তা জানার প্রয়োজন বোধ করলাম না, তেমন আগ্রহও নেই।
দেখা গেল, আমার অ্যাডভেঞ্চার জীবনের শুরুটা হয়েছিল কেবল, এরই মধ্যে আমি কিছুটা নাম কুড়িয়েছি। এমনকি এক নারী দশ লক্ষ টাকারও বেশি খরচ করতে রাজি আছেন, শুধু জানতে চান তাঁর বাড়ির বিড়ালটি কেন মাঝরাতে হঠাৎ হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে। এমন প্রশ্নের উত্তরে আমি শুধু বললাম, ‘‘একই জাতের একটি পুরুষ বিড়াল ওর পাশে শুইয়ে দাও, দেখবে আর কোনো চিৎকার নেই!’’
তবে কিছু মানুষ বেশ সিরিয়াস, তারা আমার সঙ্গে মানুষের আত্মা নিয়ে গভীর আলাপ করতে চায়। তারা জানতে চায়, আমি আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাস করি কিনা। আমি বলি, ‘‘অবশ্যই বিশ্বাস করি!’’
এরপর সে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘‘আপনি কী মনে করেন, আত্মা আসলে কী?’’
এই প্রশ্নের উত্তর এতটাই বিস্তৃত যে, আমি মুহূর্তে বুঝে উঠতে পারলাম না কীভাবে বোঝাবো। অনেক ভেবে উত্তর দিলাম, ‘‘আত্মা হয়তো একধরনের অজানা শক্তি। এই শক্তি মানুষের মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই কেউ কেউ আত্মার মুখোমুখি হলে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, পাগল হয়ে যায়—যা আমরা ভূতে ধরা পড়া বলি।’’
সে আমার উত্তর পছন্দ করল না, আবারও জানতে চাইল, ‘‘তাহলে আপনি মনে করেন, এটি কেমন ধরনের শক্তি? চৌম্বক ক্ষেত্র, না আলোক শক্তি? কেন কেউ কেউ আত্মা দেখতে পায়, কেউ পায় না?’’
আমি কখনো এত গভীরভাবে আত্মা নিয়ে আলোচনা করিনি, মজাও লাগল। তাই ভাবলাম, ‘‘তুমি কী মনে করো, আত্মা কেমন শক্তি?’’
সে বলল, ‘‘আমি মনে করি—আত্মা আর প্রাণ, দুটো আলাদা জিনিস। একসঙ্গে মিশে ভূত হয়।’’
আমি হাসতে হাসতে বললাম, ‘‘শোন, তুমি তো শব্দের খেলায় মেতেছো।’’
সে বলল, ‘‘এটা মোটেও শব্দের খেলা নয়, আমার নিজস্ব বিশ্লেষণ।’’
আমি জানতে চাইলাম, ‘‘এ দুয়ের মধ্যে পার্থক্য কী?’’
সে বলল, ‘‘একটা কথা তো নিশ্চয়ই শুনেছো—‘মানুষ সব প্রাণীর শ্রেষ্ঠ আত্মা’। অর্থাৎ আত্মা হলো এক উচ্চস্তরের, বুদ্ধিসম্পন্ন সত্তা বা চিন্তা।’’
আমি তাকে একটি আঙ্গুল উঁচিয়ে প্রশংসার ছবি পাঠালাম, কিন্তু মনে মনে ভাবলাম, ‘‘তারপর?’’ সে বলল, ‘‘আত্মা নিয়ে তো সবাই বলে তিন আত্মা ছয় প্রাণ—মানে আত্মার নানা স্তর আছে। বেশিরভাগই নিম্নস্তরের, চিন্তাহীন, বুদ্ধিহীন, অনির্দিষ্ট শক্তি।’’
আমি বললাম, ‘‘তাহলে তোমার মতে আত্মা মানে উচ্চস্তরের বুদ্ধি ও নিম্ন শক্তির সংমিশ্রণ, তাই তো?’’
সে বলল, ‘‘প্রায় তাই। আসলে আমিও এখনো পরিষ্কার জানি না আত্মা আসলে কী, কেবল একটা ধারণা। তাছাড়া বহু গবেষক স্বীকার করেছেন, মানুষ মারা গেলে শরীরের ওজন ২১ গ্রাম কমে—তাই সেটাই আত্মার ওজন!’’
এ পর্যায়ে আর বিশেষ কিছু বলার ছিল না। তবু ভাবলাম, ২১ গ্রাম কতটা ওজন? হাতে দুটি পেন্সিল নিয়ে দেখলাম, একদম হালকা, প্রায় অগণ্য। একেকটি পেন্সিল প্রায় বারো গ্রাম, দুটো চব্বিশ—অর্থাৎ তথাকথিত আত্মার চেয়েও তিন গ্রাম বেশি। তাহলে, যদি কারো আত্মা হাতে ধরে অনুভব করা যেত, কেমন লাগত? হয়ত এমনিতেই টের পাওয়া যেত না, অথচ তোমার অজান্তেই কারো আত্মা চূর্ণ হলে সে তখনই মারা যেত!
গোটা বিকেল আমি ডুবে থাকলাম এক অদ্ভুত, অপার্থিব কল্পনায়। মনে হলো যদি একবার সত্যিই আত্মার সঙ্গে কথা বলা যেত, বুঝতে পারতাম ভূত-প্রেত আসলে কী, চিরতরে সব কৌতূহল মেটাতাম।
…
অল্প কিছুক্ষণ পর, আমি হাই তুলে শুতে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখনই আমার যোদ্ধা ফোনটা অপ্রত্যাশিতভাবে বেজে উঠল—কেউ আমাকে এসএমএস করেছে। ফোন তুলে দেখলাম, খুব সংক্ষিপ্তভাবে লেখা, ‘‘তোমার ইমেইল দেখো, ফেং থিয়ানসঙ।’’
ঘুম একেবারে উড়ে গেল! ঘুম ভাঙার কারণ এসএমএস নয়, বরং ফেং থিয়ানসঙের সেই বড়ো রোদচশমা পরা, বেপরোয়া ভঙ্গির কথা মনে পড়তেই হাসি পেল। (ফেং থিয়ানসঙ বেশ মজার লোক—তাওজিয়া গ্রামের ঘটনার তদন্তে একসঙ্গে চাংবাই পাহাড়ের লেকের গভীরে ডুব দিয়েছিলাম; পঞ্চাশেরও বেশি মানুষকে নিশ্চল, পানির নিচে শুয়ে থাকতে দেখেছিলাম—বিস্তারিত ‘তিয়ানচি রাতের গল্প’-এ আছে।)
সেই ঘটনার পর থেকেই ফেং থিয়ানসঙ আমার খুব ভালো বন্ধু হয়ে গেছে। তার গোয়েন্দা সংস্থার ব্যবসা দিন দিন জমে উঠছে। শুনেছি বহু ধনী ব্যক্তি তাদের নানা সমস্যা নিয়ে ওর কাছে যায়।
তাই ফেং থিয়ানসঙের এসএমএস আসায়, না ভেবে যোদ্ধা ফোন দিয়ে ইমেইল খুললাম। দেখলাম, আগের দিন বিকেলেই সে আমাকে মেইল পাঠিয়েছে। আবার কী কাণ্ড করছে? এত গোপনীয়তা কেন? অপরিচিত নম্বর থেকে এসএমএস পাঠাতে হলো কেন? সরাসরি ফোন দিতে পারত, মেইল আর এসএমএসের কী দরকার?
এভাবে ভাবতে ভাবতে ইমেইল খুললাম। মেইলে মাত্র একটি বাক্য, ‘‘তৎক্ষণাৎ থাইল্যান্ডে চলে আয়!’’ দেখে হতভম্ব হয়ে গেলাম। সন্দেহ জাগল, এসএমএস আর মেইলটা ফেং থিয়ানসঙই পাঠিয়েছে তো? নাকি কেউ ছদ্মবেশে? আমাকে বিপদে ফেলবে?
কিন্তু আমার তো কারো সঙ্গে শত্রুতা নেই। বাইরে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করলেও মেপে চলি, কোনো ঝামেলায় যাই না। তাহলে আমাকে বিপদে ফেলবে কে?
বুঝতে না পেরে, সরাসরি ছোটো রঙধনুকে ফোন করলাম, জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘তোমার ওই ফেং আত্নীয় এখন কোথায়?’’
ছোটো রঙধনু বলল, ‘‘সে থাইল্যান্ডে গেছে। যাওয়ার আগে তোমার জন্য একটা ঠিকানা রেখে গেছে। তুমি যদি খোঁজ করো, তবে ঐ ঠিকানায় থাইল্যান্ডে গিয়ে ওকে পাবে।’’
‘‘আমি যাচ্ছি না, ভালো থাকো!’’
ফোন রেখে দিলাম। ফেং থিয়ানসঙের এই রহস্যময় স্বভাব আমাকে বিরক্ত করল। বিছানায় কাঁথা মুড়িয়ে ঘুমাতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু ঘুম এল না। শেষমেশ উঠে আবার ছোটো রঙধনুকে ফোন করলাম, বললাম, ‘‘ঠিকানা পাঠিয়ে দাও, ক’দিন পরেই যাচ্ছি। তুমি যাবে তো?’’
ও হাসতে হাসতে বলল, ‘‘জানতাম তুমি ঘরে থাকতে পারবে না। ঠিকানা এসএমএসে পাঠিয়ে দিচ্ছি। খুঁজে পেতে অসুবিধা হবে না। আমার হাতে এখন অনেক কাজ, আমি যাচ্ছি না।’’
…
তিন দিন পর, দুপুর বারোটার সময় আমি পৌঁছে গেলাম থাইল্যান্ডের ব্যাংকক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। প্লেন থেকে নামতেই মনে হলো গায়ে আগুন লেগে যাচ্ছে, তাপমাত্রা ত্রিশের ওপরে। তবু ভাবলাম, রাজকীয় থাই প্রাসাদ, কাব্যিক প্রবাল দ্বীপ, আর বিখ্যাত এবং সুন্দর রূপান্তরিত শিল্পীদের অনুষ্ঠান দেখতে পাব—এই ভেবে ক্লান্তি উবে গেল।
বিদেশি, রহস্যময় এই দেশে হাঁটছি—সবকিছু স্বপ্নের মতো লাগছিল। তবে সোজা, চওড়া রাস্তা ধরে কিছুদূর যেতেই ফেং থিয়ানসঙের ওপর কিছুটা রাগ হল। ও জানে আমি থাই ভাষা জানি না, ইংরেজিও ভালো না, তবু কেউকে পাঠায়নি আমাকে নিতে। নিজেই খুঁজে নিতে হবে—এটা কি ইচ্ছাকৃত ঝামেলা নয়?
ভাগ্য ভালো, বেশি সময় লাগেনি। একজন চীনা ভাষা বলতে পারে এমন ট্যাক্সিচালক গাড়ি নিয়ে আমার পাশে থামল। সে সাধারণ ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল আমি চীনা কিনা। বললাম, ‘‘হ্যাঁ।’’ এরপর চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছরের সেই থাই চালক হাসিমুখে একদম পরিষ্কার চীনা ভাষায় বলল, ‘‘কোথায় যাবেন, আমি নিয়ে যাব?’’
আমি মাথা নেড়ে উঠে বললাম, ‘‘ব্যাংককের চায়না টাউনের ঠিকানায় নিয়ে চলুন, ধন্যবাদ।’’ সে বলল, ‘‘এতে আবার ধন্যবাদ কিসের!’’ গাড়ি ছুটে চলল।
রাস্তায় আমাদের কথায় জানলাম, ব্যাংককে প্রচুর থাই লোক চীনা ভাষা জানে। বিশেষ করে উত্তর থাইল্যান্ডের চিয়াং রাই অঞ্চলের কিছু গ্রাম চীনের ইউনান এলাকার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। অনেকে শুধু চীনা জানে তা নয়, একদম নিখুঁত উচ্চারণে বলে, এমনকি ইউনান অঞ্চলের কিছু উপভাষাও জানে—ভীষণ আপন মনে হলো।
গাড়ি কয়েকবার বাঁক নিল। চালক জানাল, বিশ মিনিটের মতো লাগবে। সে জিজ্ঞেস করল, আমি বন্ধুর খোঁজে এলাম, রূপান্তরিত শিল্পীদের দেখতে নাকি অন্য কোনো কারণে। আমি হেসে বললাম, ‘‘তুমি জিজ্ঞেস করলে না—ভ্রমণে এসেছি কিনা?’’ সে বলল, ‘‘তুমি থাই ভাষা জানো না, দেশটাও চেনো না, ট্যুর গ্রুপ ছাড়াই একা ঘুরতে এসেছো—এটা কি সম্ভব?’’
আমি বললাম, ‘‘তুমি বেশ বুদ্ধিমান।’’
সে বিনয়ের হাসি হেসে, হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ‘‘জানো, ডিনান সংতিচা নামের এক তরুণী অভিনেত্রীকে? সম্প্রতি আইডল ড্রামায় খুব জনপ্রিয়।’’
আমি বললাম, ‘‘টিভি সিরিয়াল কমই দেখি, বিশেষ করে আইডল ড্রামা।’’
সে একটু আফসোস করে বলল, ‘‘দুঃখজনক!’’
আমি বললাম, ‘‘কিসের জন্য দুঃখ?’’
সে বলল, ‘‘ডিনান কয়েকদিন আগে মারা গেছে, তাই ওর অভিনীত নতুন কোনো নাটক আর দেখতে পারবে না।’’
আমি কথার ধার ধরে বললাম, ‘‘মারা যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়, সুন্দরী অভিনেত্রী হলেও মৃত্যু আটকাতে পারে না। কী রোগে মারা গেল?’’ আমি মুখে কথা বলছিলাম ঠিকই, কিন্তু মনে মনে চটেছিলাম—কখন ফেং থিয়ানসঙের সঙ্গে দেখা হবে!
এমন সময়, চালকের কণ্ঠ হঠাৎ এক রহস্যময় সুর পেল। মাথা নাড়িয়ে বলল, ‘‘সে কোনো রোগে মারা যায়নি, কোনো দুর্ঘটনাও হয়নি, যেমন গাড়ি দুর্ঘটনা। আর কেউ তাকে হত্যা করেনি।’’
আমি একটু কৌতূহলী হয়ে বললাম, ‘‘তাহলে কীভাবে মারা গেল? বয়স কত ছিল? কবে মারা গেল?’’
চালক বলল, ‘‘গত মাসেই। বয়স? মাত্র সতেরো বছর পূর্ণ হয়েছিল! খুবই তরুণী, তাই তো? এবার তুমি অনুমান করো, কীভাবে মারা গেল?’’
আমি মাথা চুলকে বললাম, ‘‘এটা অনুমান করা কঠিন। দুর্ঘটনা নয়, অসুস্থতাও নয়, খুনও নয়... সত্যি বলতে পারছি না, ভাই, আর রহস্য করো না—বলেই দাও।’’
তখন চালক এমন এক উত্তর দিল, যা আমি কোনোভাবেই ভাবিনি।
সে স্পষ্ট স্বরে বলল, ‘‘সে... সে... সে ভূতের কামড়ে মরে গেছে!’’ আমি দেখলাম, এই কথা বলতে গিয়ে তার মুখও ফ্যাকাশে হয়ে উঠল।